▶Story Transcript
কৃষ্ণদেব রায় ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা, আর তাঁর সভার সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন তেনালি রামান। একদিন তেনালির স্ত্রী রান্না করতে গিয়ে বললেন, “রামান, রাজবাগানের বেগুনের স্বাদ শুনেছি অপূর্ব। আমার বড় সাধ, যদি একবার খেতে পারতাম!”
তেনালি রামান স্ত্রীর মনের কথা ফেলে রাখতে পারলেন না। রাত গভীর হলে, তিনি চুপিচুপি রাজপ্রাসাদের বাগানে ঢুকে পড়লেন। চাঁদের আলোয় হাসছে বেগুনগাছের পাতাগুলো। রামান সাবধানে সবচেয়ে বড়, উজ্জ্বল বেগুনগুলো ছিঁড়ে নিলেন। আক্রান্ত না হয়ে ঘরে ফিরে এলেন।
পরদিন সকালে, ঘরে বেগুন ভাজির গন্ধে চারপাশ ভরে গেল। তেনালির স্ত্রী চুমুক দিয়ে বললেন, “কি অপূর্ব স্বাদ! তুমি তো সত্যিই আশ্চর্য!”
কিন্তু বিপদ আসে নীরব পায়ে। তেনালির ছোট্ট ছেলে, রামু, দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখেছিল। দুপুরে রাজবাড়িতে খেলতে গিয়ে সে খোশগল্পে বলে ফেলল, “আমার বাবা তো কাল রাতে রাজবাগান থেকে বড় বড় বেগুন এনেছিলেন!”
রাজবাড়ির চাকর শুনে ছুটে গেলেন রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের কাছে। রাজা চৌকস ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে সভা ডাকলেন।
রাজা বললেন, “তেনালি রামান, শুনেছি তুমি আমার বাগান থেকে বেগুন চুরি করেছ? বলো, সত্যি কি না!”
তেনালি মাথা নিচু করলেন। জানেন, সত্য ধরা পড়ে গেলে শাস্তি নিশ্চিত।
রাজা হুকুম দিলেন, “তোমার ছেলে কি জানে কিছু?”
রামান উত্তর দিলেন, “রাজন, আপনার সামনে আমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন।”
রাজা রামুকে ডাকলেন। ছোট্ট রামু এসে দাঁড়াল।
রাজা বললেন, “বলো তো, কাল রাতে কী দেখেছিলে?”
রামু বলল, “আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, বাবা বাগান থেকে বড় বড় বেগুন এনে মায়ের হাতে দিলেন।”
রাজা অবাক, “স্বপ্নে?”
রামু মাথা ঝাঁকাল, “হ্যাঁ, রাজন, স্বপ্নেই দেখেছি। তখন জানালার বাইরে ঘন বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি ঘুমের ঘোরে দেখছিলাম।”
রাজা হাসলেন, “দেখলে তেনালি, তোমার ছেলে তো স্বপ্ন দেখেছে! তাহলে তো চুরির কোনো প্রমাণ থাকল না।”
কিন্তু কেউ জানল না, আগের রাতে তেনালি রামান ছেলের ওপর এক বালতি জল ঢেলে দিয়েছিলেন। আর ফিসফিসিয়ে বলেছিলেন, “রামু, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে! জানালার পাশে শুয়ো না, ভিজে যাবে।” রামু অর্ধঘুমে ঠিক বুঝতে পারেনি আসল ঘটনা।
রাজার সভায় তেনালি রামান মাথা নত করে বললেন, “রাজন, আমি তো কোনো বেগুন চুরির কথা জানি না। নিশ্চয়ই আমার ছেলে স্বপ্নে দেখেছে।”
রাজা হাসতে হাসতে বললেন, “তেনালি, তোমার ছেলে বড় মজার! কে জানে, হয়তো বেগুন চোরের স্বপ্নই দেখেছে!”
সবার হাসির মাঝে তেনালি রামান চোখ টিপে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। স্ত্রীর মুখে প্রশান্তির হাসি, কারণ তাঁর সাধের রাজবাগানের বেগুন তিনি পেয়েছেন।
ঘরে ফিরে তেনালি ছেলেকে কোলে তুলে বললেন, “রামু, স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্য না জানলে মানুষ বড় বিপদে পড়ে। তাইতো আজ আমাদের বাঁচাল তোমার স্বপ্ন। ভাবো তো, বৃষ্টি ছাড়া জানালার পাশে কেন ভিজেছিলে?”
রামু বিস্মিত হয়ে বলল, “বাবা, তাহলে সত্যিই আমি ঘুমে ছিলাম? তুমি আমাকে জাগিয়ে বললে যে বৃষ্টি হচ্ছে?”
তেনালি হেসে বললেন, “তুমি তো সবসময় স্বপ্ন দেখো, আজ তোমার স্বপ্নই আমাদের রক্ষা করল।”
এইভাবে তেনালি রামান নিজের বুদ্ধি আর উপস্থিত জ্ঞানে রাজাকে বিভ্রান্ত করলেন, রাজবাগানের বেগুনও স্ত্রীর ভাগে গেল। আর ছোট্ট রামু শিখে নিল, সব সময় স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে তফাৎ করতে জানতে হয়।
মহারাজ কৃষ্ণদেব রায়