▶Story Transcript
একদিন গভীর জঙ্গলে এক সিংহ শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। বনের রাজা বলে কথা, তার চলন-বলনে সবসময়ই ছিল অহংকার আর আত্মবিশ্বাস। হঠাৎ সিংহটি খাবারের খুঁজে গিয়ে একটি বড় হাড্ডির টুকরো গিলতে গিয়ে সেটি তার গলায় আটকে গেল। সে ভীষণ কষ্ট পেতে লাগল, নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না, গলা ব্যথায় ছটফট করতে লাগল।
সিংহের কাঁদো কাঁদো অবস্থা দেখে বনজীবরা সবাই ভয়ে দূরে সরে গেল। কেউ তার কাছে যেতে সাহস করল না। আর সবাই জানে, রাগী ও আহত সিংহ সহজেই আক্রমণ করতে পারে।
সেই সময়ে, কাছে এক বুদ্ধিমান কাঠঠোকরা গাছের ডালে বসে ছিল। সে সিংহটিকে কষ্ট পেতে দেখে নিজের কাছে ভাবল, “সাহস যদি থাকে, তবে দানবকেও সাহায্য করা যায়। হয়তো উপকার করলে কোনো একদিন কাজে লাগবে।”
কাঠঠোকরা সাহস করে সিংহের কাছে গিয়ে বলল, "বনের রাজামশাই, আপনি এত কষ্ট পাচ্ছেন কেন?"
সিংহ গর্জে উঠল, “গলায় হাড় আটকে গেছে। কেউ যদি আমাকে উদ্ধার করে, তার জন্য আমি মূল্যবান পুরস্কার দেব।”
কাঠঠোকরা বলল, “আপনি যদি আমাকে আঘাত না করেন, আমি চেষ্টা করতে পারি।”
সিংহ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তখন কাঠঠোকরা তার সরু ও লম্বা ঠোঁট দিয়ে সিংহের মুখে ঢুকে পড়ল। খুব সাবধানে সে হাড়ের টুকরোটি খুঁজে বের করে টেনে বের করল। এরপর কাঠঠোকরা দ্রুত সিংহের মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
হাড় বেরিয়ে যেতেই সিংহ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে আবার প্রাণ ফিরে পেল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সিংহ মাথা উঁচু করে দাঁড়াল।
কাঠঠোকরা খুশি মনে বলল, “রাজামশাই, আমি আপনার উপকার করলাম। কথা দিয়েছিলেন, আমাকে পুরস্কার দেবেন। এবার কি আমার উপহার পাব?”
সিংহ গম্ভীর মুখে বলল, “তুই কি এখনো বেঁচে আছিস না? আমার মুখে ঢুকে ভিতরে গিয়ে আবার ঠিকঠাক বেরিয়ে এসেছিস—এটাই তো সবচেয়ে বড় উপহার। আমি তো তোকে খাইনি, এটাই তো তোকে বাঁচিয়ে দিলাম। আর কিসের পুরস্কার চাস?”
কাঠঠোকরা অবাক হয়ে গেল। সে ভাবল, “আমি এত বড় বিপদে সাহায্য করলাম, অথচ সে কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করল না!”
কাঠঠোকরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “রাজামশাই, উপকারীর কৃতজ্ঞতা তো থাকা উচিত, নাহলে তো কেউ আর বিপদের সময় সাহায্য করতে সাহস পাবে না।”
সিংহ গর্জে উঠল, “তুই যা! ভাগ এখান থেকে! বনের রাজার কাছে কৃতজ্ঞতার আশা করিস না।”
কাঠঠোকরা দুঃখে চুপচাপ উড়ে গেল। সে বুঝে গেল, গর্ব ও অহংকার অনেকসময় কৃতজ্ঞতাকে গ্রাস করে ফেলে। তারপর থেকে সে আর কোনো অহংকারী প্রাণীর বিপদে সাহায্য করতে সাহস পায়নি।
বনের অন্য পশুরা এই ঘটনা দেখে বলল, “কাঠঠোকরা সাহস দেখিয়েছিল, কিন্তু কৃতজ্ঞতার আশায় ভুল করেছিল। আমাদেরও উচিত, উপকার করলেও অহংকারী ও অকৃতজ্ঞের থেকে কৃতজ্ঞতা না আশা করা।”
এই গল্প থেকে আমরা শিখি, কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা এক মহৎ গুণ। অন্যের উপকার করলে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করা উচিত, আর উপকার করলে প্রত্যাশা না রেখে নিঃস্বার্থ হতে হয়।