ক্ষুধার্ত ঋষি ও খরগোশের আত্মত্যাগ: শিক্ষা ও করুণার গল্প
Folklore

ক্ষুধার্ত ঋষি ও খরগোশের আত্মত্যাগ: শিক্ষা ও করুণার গল্প

এক খরগোশ নিজের দেহ উৎসর্গ করে ক্ষুধার্ত ঋষিকে সাহায্য করে, আর ঋষি আসলেই দেবতা রূপে তার মহানুভবতাকে আশীর্বাদ দেন। এই গল্পটি আত্মত্যাগ ও মানবতার চিরন্তন...

by Storiyaa Editorial
Panchatantra Tales (bn)

Episode 2 of 5

Panchatantra Tales (bn)

Up next · Episode 3 of 5

রাণীর ঈর্ষা ও হাতির করুণ পরিণতি: অতীত জীবনের শিক্ষা

About This Story

Story Transcript

বহু বছর আগে, এক গভীর অরণ্যে বাস করত অনেক প্রাণী। সেই অরণ্যের মাঝখানে ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা এক ছোট টিলা। সেখানে বাস করত এক দয়ালু খরগোশ, যে সবার ভালো চাইত। খরগোশের বন্ধুরা ছিল বানর, শিয়াল এবং ওল। তারা সবাই একে অপরকে সাহায্য করত এবং সুখে-শান্তিতে দিন কাটাত। একদিন খরগোশ তার বন্ধুদের ডেকে বলল, “বন্ধুরা, আমাদের উচিত যেসব অতিথি বা পথিক এই অরণ্যে আসে, তাদের সাহায্য করা। আমরা যদি কারও কষ্ট কমাতে পারি, সেটাই হবে আসল আনন্দ।” সবাই খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেল। তারা ঠিক করল, কেউ যদি ক্ষুধার্ত হয়ে অরণ্যে আসে, তারা নিজেদের খাবার ভাগাভাগি করে দেবে। কিছুদিন পর, একদিন অরণ্যে প্রবেশ করলেন এক বৃদ্ধ ঋষি। তিনি অনেকদিন ধরে উপবাস করছিলেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে গভীর অনাহার। তিনি গাছের ছায়ায় বসে পড়লেন, আর ফিসফিস করে বললেন, “যদি কেউ একটু খাবার দিত, তবে বাঁচতাম।” প্রথমে শিয়াল ছুটে গেল, বনে ফলমূল খুঁজে নিয়ে ফিরে এল। বানরও কিছু পাকা ফল খুঁজে নিয়ে এল। ওলও বন থেকে কন্দ এনে দিল। কিন্তু যখন ঋষি সব দেখে বললেন, “দুঃখিত, আমি শুধু রান্না করা খাবার খেতে পারি,” তখন সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। শুধু খরগোশের মনে হলো, তার তো কোনো রান্না করা খাবার নেই। সে গভীরভাবে ভাবল, কিভাবে সে সাহায্য করতে পারে। তারপর সে সাহস নিয়ে বলল, “আমার দেহেই তো তোমার প্রয়োজনীয় খাবার আছে। তুমি চাইলে আমাকে খেয়ে নিতে পারো।” বন্ধুরা হতবাক হয়ে গেল। কেউ বলল, “খরগোশ, তুমি কি তোমার জীবন দিতে চাও?” খরগোশ শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “সত্যিকারের সাহায্য মানে নিজের সেরা কিছু দিতে পারা। যদি আমার দেহ দিয়ে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের প্রাণ বাঁচে, সেটাই হবে আমার বড় পাওয়া।” ঋষি অবাক হয়ে খরগোশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। খরগোশ তখন আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ এনে দিল এবং বলল, “তুমি চলো, আগুন জ্বালাও। আমি নিজেই আগুনে ঝাঁপ দেব, তুমি আমাকে রান্না করে খেয়ো।” ঋষির চোখে জল এসে গেল। তিনি সেই আগুন জ্বালালেন, আর খরগোশ নিজের ইচ্ছায় আগুনের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঋষি মাঝপথে দাঁড়িয়ে বললেন, “থেমে যাও, খরগোশ! আমি আসলে একজন সাধারণ ঋষি নই। আমি স্বয়ং ইন্দ্র, দেবতাদের রাজা। মানুষের দয়া ও আত্মত্যাগ পরীক্ষা করতেই আমি এই রূপে এখানে এসেছি।” অবাক হয়ে চারপাশের সবাই দেখল, বৃদ্ধ ঋষির বদলে ঝলমলে এক দেবতা দাঁড়িয়ে আছেন। ইন্দ্র মৃদু হাসলেন, বললেন, “তোমার হৃদয়ের বিশুদ্ধতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি তোমার আত্মত্যাগের কথা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেব, যাতে সবাই জানে তুমি কত মহান।” ইন্দ্র তখন হাতের আঙুল ছুঁইয়ে খরগোশের দেহে এক উজ্জ্বল চিহ্ন এঁকে দিলেন। বললেন, “আজ থেকে চাঁদের গায়ে তোমার প্রতিচ্ছবি চিরকাল থাকবে। সবাই তোমাকে দেখবে, তোমার ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের কথা মনে রাখবে।” চাঁদের গায়ে খরগোশের ছায়া আজও দেখা যায়। সেই থেকে পৃথিবীর মানুষ এই গল্প শোনে আর শেখে, সবার উপকারে, নিঃস্বার্থ ভাবে সাহায্য করাই আসল ধর্ম। খরগোশ ও তার বন্ধুরা আবারও আনন্দে দিন কাটাতে লাগল। আর অরণ্যের প্রাণীরাও বিশ্বাস করল, দয়া আর আত্মত্যাগ যে কাউকে মহান করে তোলে। এই গল্প শেখায়, কখনো কখনো নিজের স্বার্থ ভুলে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।